ভোটকেন্দ্র পাহারা দেব, কেউ যেন হাঁস চুরি করতে না পারে

Date: 2026-02-05
news-banner

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ বেশ জমে উঠেছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রচারের মাত্রা তত বাড়ছে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা হাঁস প্রতীক নিয়ে পুরো নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়িয়ে প্রচারের আলো তাঁর দিকে নিয়েছেন। অন্যদিকে কলার ছড়ি প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন বিএনপির অন্য বিদ্রোহী প্রার্থী এস এন তরুণ দে। 

তবে বিএনপির মিত্র দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় ভোটের সমীকরণে ভিন্ন কিছু ঘটতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এখানে জমিয়তের সহসভাপতি মাওলানা জোনায়েদ আল হাবিব খেজুর গাছ নিয়ে লড়ছেন। দেরিতে প্রচারে নেমেও আলোচনায় রয়েছেন লাঙ্গল প্রতীকের জাতীয় পার্টির দুবারের নির্বাচিত এমপি অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধাও।
এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের এনসিপির প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন (শাপলা কলি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেছার আহমাদ (হাতপাখা), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির অ্যাডভোকেট তৈমুর রেজা মো. শাহজাদ (তারা), ইনসানিয়ত বিপ্লব বাংলাদেশের মঈন উদ্দিন (আপেল) এবং আমজনতা দলের শরিফা আক্তার (প্রজাপতি)। গত রবি ও সোমবার নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন স্তরের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনী দৌড়ে রুমিন ফারহানা বেশ সাড়া ফেলেছেন। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানে ভোটারদের সাড়া পাচ্ছেন। এ ছাড়া আঞ্চলিকতার কারণে ভোটের সমীকরণ তাঁর অনুকূলে রয়েছে। আবার নারীপ্রার্থী হওয়ায় প্রায় অর্ধেক সংখ্যক নারী ভোটার তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি সরাইল উপজেলার ৯টি, আশুগঞ্জ উপজেলার আটটি এবং বিজয়নগর উপজেলা চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়নসহ ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। ভোটার চার লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৬৫ হাজার ২৪৫ এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৩৪ হাজার ২০১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার দুজন। 

ভোটের সমীকরণে দেখা যাচ্ছে, রুমিন ফারহানা স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে। পাশের ইউনিয়নটি হচ্ছে শাহজাদাপুর, যার সঙ্গে রুমিনের বিশেষ যোগাযোগ রয়েছে। এই ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর বিশেষ অবদান আছে। এর সঙ্গে লাগোয়া বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়ন। বুধন্তী ইউনিয়নের শশৈই গ্রামটি রুমিন ফারহানার পিতৃভূমি। এখান থেকে তাঁর বাবা ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ ১৯৭৩ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তাই বিজয়নগরের চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়নের ভোটারদের কাছেও তিনি ওই এলাকার মেয়ে হিসেবে সহানুভূতি পেতে পারেন। এ দুই ইউনিয়নের ভোটার সংখ্যা ২৭ হাজার ৭৪০। শাহবাজপুর ও শাহজাদাপুর ইউনিয়নে ভোটার প্রায় ৫০ হাজার। 
রুমিন ফারহানা এ চারটি ইউনিয়নকে নিজের এলাকা হিসেবে দাবি করেন এবং নির্বাচনে ভোটের দুই-তৃতীয়াংশ হাঁসের বাক্সে যাবে বলে অভিমত ভোটারদের। তা ছাড়া সরাইল উপজেলার ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত অরুয়াইল, পাকশিমুল ও পানিশ্বর ইউনিয়নের ভোটারদের বেশ সমর্থন পাচ্ছেন রুমিন ফারহানা। সরাইল সদর আসনে বিএনপির উপজেলা কমিটির নেতৃত্বের প্রভাব থাকলেও এখানেও তাঁর জোয়ার দেখা গেছে। 

এদিকে সরাইলের কালিকচ্চ ও নোয়াগাঁও ইউনিয়নে দুজন প্রভাবশালী প্রার্থী রয়েছেন। জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধার বাড়ি কালিকচ্চ গ্রামে, তাঁর জ্ঞাতিগোষ্ঠী নোয়াগাঁও গ্রামে। 
অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এন তরুণ দের বাড়ি নোয়াগাঁও গ্রামে। এ দুটি ইউনিয়নে জিয়াউল হক ও তরুণ দের মাঝে ভোট ভাগাভাগি হলেও এ দুই ইউনিয়ন থেকেও রুমিন ভালো ভোট পেতে পারেন। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য ফ্রন্টের মহাসচিব ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এস এন তরুণ দে সংখ্যালঘুদের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। সংখ্যালঘু কমিউনিটির একাধিক নেতা জানান, তরুণ যে ভোট পাবেন এটাও তিনি না থাকলে রুমিনের বাক্সে যেত। তবে সংখ্যালঘুদের মাঝে কিছুটা আতঙ্ক থাকায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে দোটানা রয়েছে। 

রোববার বিকেলে নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বুড্ডা খেয়াঘাটের একটি চা স্টলে ভোটারদের আড্ডায় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা হয়। তারা ক্ষোভের সঙ্গেই জানান, সরাইল আসনটি বিএনপি জোট রক্ষায় বহিরাগত প্রার্থীকে দেয়। যাদের ভোটের পরে আর দেখা যায় না। এর ফলে এলাকা উন্নয়ন বঞ্চিতই থাকে। 
নাম প্রকাশ না করে তারা জানান, আমরা কোনো বহিরাগত, কোনো রোহিঙ্গা প্রার্থীকে ভোট দেব না। আমাদের ঘরের মেয়ে পাশের ইউনিয়নের হাঁস প্রতীকের প্রার্থীর সঙ্গে আছি। উপস্থিত এক প্রবীণ ভোটার বলেন, ‘এবার আমরা ভোটকেন্দ্র পাহারা দেব, যেন হাঁস চুরি না হয়।’

এদিকে বিএনপির মিত্র দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য দলের চেয়ারম্যান নির্দেশ দিলেও জোনায়েদ আল হাবিবের পক্ষে নেতাকর্মীদের মাঠে নামানো যায়নি। মানসম্মান বাঁচানোর জন্য খেজুর গাছের পক্ষে কিছু কিছু নেতাকর্মী নামলেও বাকি সময়ে ভোটারদের মাঝে কতটুকু আবেদন সৃষ্টি করতে পারবেন–এ নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। একাধিক ধর্মীয় সংগঠনের প্রার্থী থাকায় এবং মতাদর্শগত বিভক্তির কারণেও খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থী সাধারণ ভোটারদের মাঝে তেমন সাড়া জাগাতে পারেননি।
এ ছাড়া দেড় লক্ষাধিক ভোটারের আশুগঞ্জ উপজেলায় বিএনপির বিদ্রোহী দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে জানা গেছে। বিএনপির মূল নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে ভোটাররা রুমিন ফারহানা ও তরুণ দের পক্ষে কাজ করছেন। এ উপজেলায় সুন্নি জামায়াতের আধিক্য থাকায় তারা জোনায়েদ আল হাবিবের বিরুদ্ধে। এ আসন থেকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নেছার আহমাদের বাড়ি আশুগঞ্জে। ফলে তিনিও চাইবেন আঞ্চলিকতার সহানুভূতি নিতে, যাতে হাবিবের ভোটে প্রভাব পড়তে পারে। 

দলীয় নেতাকর্মীরা রুমিনের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। এ কারণে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সরাইল উপজেলার শাহজাদাপুর ইউনিয়ন বিএনপির কমিটির স্থগিত, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিবসহ ৯ জনকে বহিষ্কার করা হয়। শাস্তির কথা উপেক্ষা করে রুমিনের পক্ষেই নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তারা।
স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এন তরুণ দে কলার ছড়ি প্রতীক নিয়ে জনগণের দ্বারে যাচ্ছেন। এলাকার শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সামাজিক উন্নয়নে পাশে থাকার অঙ্গীকার করছেন। তিনি বলেন, জনগণ ব্যাপক সাড়া দিচ্ছেন। প্রতিটি জনসভা ও মিছিলে হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন। বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার আশা প্রকাশ করেন এই প্রার্থী।
জোনায়েদ আল হাবিব জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশা ব্যক্ত করে বলেন, বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী আমার পক্ষে মাঠে নেমেছেন। শুধু তাই নয়, গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলেম-ওলামা ঐক্যবদ্ধভাবে পক্ষে রয়েছেন।
গতকাল বিকেলে সরাইলের অরুয়াইল ইউনিয়নের রাণীদিয়ায় জনসভায় রুমিন বলেন, এলাকাবাসীর জন্য সুখবর নিয়ে এসেছি। ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত যখন এমপি ছিলাম, তখন ২০২১ সালে অরুয়াইলের ছেত্রা নদীর ওপর ব্রিজ ও অরুয়াইল-রাণীদিয়া-রাজাপুর-কাকুরিয়া পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণের জন্য ডিও লেটার দিয়েছিলাম, তা সম্প্রতি একনেক সভায় অনুমোদন হয়েছে। আপনাদের ভোটে ও দোয়ায় আমি যদি এমপি নির্বাচিত হতে পারি, তাহলে এ ব্রিজের নির্মাণকাজের উদ্বোধনের সময় আমি উপস্থিত থাকব।

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News