দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা প্রভাব ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

Date: 2026-02-06
news-banner

দক্ষিণ এশিয়ায় বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে চীন তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন উদীয়মান শক্তি হিসেবে সেই একই প্রকল্পগুলো তার ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। দুই দশক ধরে চীন দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তার অবস্থান প্রসারিত করে নিজেকে অবকাঠামো ও স্থিতিশীলতার দিক থেকে একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে তুলে ধরেছে। ২০২১ সালে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ত্যাগ করে। এর ফলে প্রত্যাশা আরও বেড়েছে– বেইজিং উদীয়মান শক্তির শূন্যতা পূরণ করবে।

তবে স্থগিত চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের সাম্প্রতিক প্রমাণসহ আরও বেশ কয়েকটি দিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এ ছাড়া আফগানিস্তানে অব্যাহত নিরাপত্তা হুমকি, এমনকি তালেবান-পাকিস্তান আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আরও সহজ করতে বেইজিংয়ের অক্ষমতা ইঙ্গিত দেয় যে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং তার কর্মক্ষমতার বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান রয়েছে। এ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যেমন– এই ক্রমবর্ধমান প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের দাবি ও এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হিসেবে তার মর্যাদা কতটা ক্ষুণ্ন করে?

২০১৩ সাল থেকে পাক-আফগান অঞ্চলটি এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উদোম হয়ে পড়েছে। দেশটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা ভিত্তি গড়ে তোলা দরকার, তা চিন্তা না করেই এগোতে চেয়েছে। বেশ কিছু কাঠামোগত এবং নিরাপত্তাজনিত বিষয় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে চীনের জন্য একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যে সংকট আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় অনেক জটিল। অন্যান্য অঞ্চলে হুমকিগুলো মূলত কাঠামোগত ও রাজনৈতিক, স্পষ্টতই চীনবিরোধী নয়।
পাক-আফগান অঞ্চলে চীনকে প্রায়ই কেবল বিনিয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনেরও বহিরাগত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করে যেতে সক্ষমতার অভাব রয়েছে, যদিও তারা কখনও এ ধরনের বিদেশি মিশনে নামেনি। তাই কোনো বিপর্যয় দ্রুত বেইজিংয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করলে আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া চীনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ এবং সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে, এই বিষয়টি বিশেষত যেসব দেশে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সেখানে প্রযোজ্য। 

এ ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তা-উন্নয়ন সম্পর্ক’ বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ যেখানেই নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, সেখানেই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বৈধতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকৃতপক্ষে পাক-আফগান অঞ্চলে চীনের মর্যাদা হ্রাস পাওয়ার কারণ মূলত বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে শাসনক্ষমতায় রূপান্তরিত করার অক্ষমতার ফল। এই ব্যবধান দক্ষিণ এশিয়ায় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের প্রধান দুর্বলতা হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য, যা মূলত সিপিইসির জন্য ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রতিশ্রুতি এবং আফগানিস্তানে অতিরিক্ত উচ্চমূল্যের সম্পদ ও অবকাঠামোগত ছাড়ের ওপর কেন্দ্র করে গঠিত। এই বিনিয়োগগুলো দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধন করে। এক. চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়া; দুই. বেইজিংয়ের কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব আরও জোরালো করা। প্রকল্পের সফল সমাপ্তি উভয় উদ্দেশ্যকেই এগিয়ে নেবে।

বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মধ্যস্থতা, দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিকভাবে নিঃশর্ত উন্নয়নে সহায়তা দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে প্রতিপত্তি তৈরির চেষ্টা করে আসছে। তবুও আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে চলমান ব্যাঘাত এই ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। যেমন– বেলুচিস্তানে আর্থিক অস্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে শুরু করে স্থানীয় অসন্তোষ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি করা ইত্যাদি। সরকারি বয়ানের বিপরীতে চীনের শাসনব্যবস্থার জটিল বাস্তবতা, আয়োজক দেশের রাজনীতি ও ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য দেশটি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। তালেবান-পাকিস্তান আলোচনার ব্যর্থতা পরোক্ষভাবে চীনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়াকে তীব্র করেছে।  

যে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী, সেটি এখন কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে বিভিন্ন অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছে। মূলত দেশটির দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। যদি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের প্রধান প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত সিপিইসি এত দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, বিলম্ব ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, তাহলে এটি অন্যান্য দেশকে কী বার্তা দেবে? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব অঞ্চলে চীনের নিয়ন্ত্রণ সীমিত সেখানে কীভাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মর্যাদা বহাল রাখবে? 

বেহরুজ আয়াজ: ইরানি বিশ্লেষক; এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News