সামাজিক মাধ্যমে ‘ইঙ্কড ইউর ফিঙ্গার’, ফাঁকা ঢাকায় নির্বাচনী ‘রিইউনিয়ন’
Date: 2026-02-19
ভোটের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা এখন অনেকটাই ফাঁকা। বহু বছরের পুরনো গাছগুলোর ফাঁক গলে সিদ্ধেশ্বরীর সড়কে রোদ এসে পড়লেও চিরচেনা কোলাহল নেই। একই দৃশ্য বেইলী রোড, মগবাজারে। চালু থাকা চায়ের দোকানগুলোতে আলোচনার একটাই প্রসঙ্গ- নির্বাচন।
কয়েকটি এলাকায় তরুণ ও নতুন ভোটারদের মধ্যে আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসছিল কয়েকটি শব্দগুচ্ছ- ‘জুলাই স্পিরিট’, একাত্তরের চেতনা ও ‘সোশ্যাল রিইউনিয়ন’। ছিল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকেন্দ্রিক পরিকল্পনাও। অনেকেই জানালেন, ভোট দেওয়ার পর অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে তারা আপলোড করা ছবিতে ‘ইঙ্কড ইউর ফিঙ্গার’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করবেন।
মগবাজার রেলগেট এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরিয়ানও এমন কথাই জানালেন। তাঁর মতে, এবারের ভোট ঘিরে শুরু হবে নতুন একটি ‘ট্রেন্ড’ বা ‘ভাইব’।
আরিয়ান বলেন, আগে ভোট দেওয়া নিয়ে তরুণদের মধ্যে অনীহা ছিল। কিন্তু এখন বিষয়টা ‘কুল’। আমরা বন্ধুরা মিলে ঠিক করেছি, কাল (বৃহস্পতিবার) সকালে সবাই সাদা পাঞ্জাবি আর জিন্স পরে কেন্দ্রে যাব। এটা আমাদের কাছে ফেস্টিভ্যালের মতো। নিজের অধিকার প্রয়োগ করার মধ্যে একটা ‘পাওয়ার’ আছে। সেটি আমরা ‘এনজয়’ করতে চাই।

ট্রেন্ড্রের বিপরীতে প্রার্থীদের দায়িত্বের জায়গা মনে করিয়ে দিলেন চারুকলার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। তিনি এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। নুসরাত বলেন, আমাদের প্রজন্ম এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা শুধু প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী না। প্রয়োগ দেখতে চায়। স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, এবার তারা কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার স্মার্ট সমাধান চায়।
এবারের নির্বাচনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে গণভোট। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা রাশেদ বলেন, এ নিয়ে সরকারিভাবে যা প্রচার করা হয়েছে তা অনেকেই বুঝতে পারে না। তিনি নিজেই বন্ধুদের নিয়ে অনেক মানুষকে গণভোট সম্পর্কে বুঝিয়েছেন।
নির্বাচনের একদিন পরই ভালোবাসা দিবস। কিন্তু চায়ের আড্ডাগুলোতে তরুণদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন আলাপ নেই। বরং দলগুলোর ইশতেহার আর আগামীর প্রত্যাশা নিয়েই চলছিল তর্ক-বিতর্ক। একই সঙ্গে ফাঁকা ঢাকায় ভোট দেওয়ার পরের পরিকল্পনাও বিনিময় করছিলেন কেউ কেউ।
ভোটকেন্দ্র যখন ‘মিনি রিইউনিয়ন’
সিদ্ধেশ্বরী ও বেইলী রোড এলাকার অনেক তরুণের ভোটকেন্দ্র পড়েছে তাদেরই ছোটবেলার স্কুলগুলোতে। ফলে ভোটের দিনটি তাদের কাছে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার একটি অঘোষিত ‘রিইউনিয়ন ডে’।
মগবাজারের বাসিন্দা এবং আইটি প্রফেশনাল সাকিব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমার স্কুলেই ভোটকেন্দ্র। লাইনে দাঁড়ালেই বন্ধু ও পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। তাই এখন থেকেই আমরা পরিকল্পনা করেছি, সকাল ১০টার মধ্যে ভোট দিয়ে রিকশায় করে ফাঁকা ঢাকায় ঘুরব। ফেসবুকে ছবি আপলোড তো ‘মাস্ট’।
সামাজিক মাধ্যম ঘিরে প্রস্তুতি
নির্বাচন ঘিরে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে পোস্টের ট্রেন্ড গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে জেনজিদের মধ্যে। অনেকেই পরিকল্পনা করছেন ভোটকেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার। কয়েকজন জানালেন তারা ‘ভোট ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ ডিসাইডস’, ‘মাই ভোট মাই ভেয়েস’, ‘ইঙ্ক ইউর ফিঙ্গার’, ‘রিমেমবারিং জুলাই’, ‘লিগ্যাসি অব নাইনটিন সেভেনটিওয়ান’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করবেন। কেউ আবার নিজের ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিডিও ব্লগ ও ‘রিলস’ বানানোর পরিকল্পনাও করছেন।

বেইলী রোড এলাকার বাসিন্দা ও সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার মাইশা হক বলেন, ‘আমি আমার ফলোয়ারদের দেখাতে চাই যে, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সকলের ভোট দেওয়া উচিত। ভোট দেওয়া শেষে আঙুলের কালির ছবিটা স্টোরিতে দেওয়া হবে এক ধরণের ‘ডিজিটাল ব্যাজ অব অনার’।
জুলাইয়ের স্মৃতি ও ভোট বিপ্লবের আশা
মগবাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান সাকিবের সঙ্গে। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমাদের জেনারেশন রাস্তায় রক্ত দিয়েছে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের জন্য। একাত্তর আমরা দেখিনি, কিন্তু চব্বিশের জুলাই আমরা দেখেছি। এই ভোটটা আমাদের কাছে সেই রক্তের দায় শোধ করার একটি সুযোগ। কালকের (বৃহস্পতিবার) ভোট হবে সেই ‘জুলাই স্পিরিট’ এর প্রতিফলন।
তরুণ ভোটারদের কথায় স্পষ্ট, তারা এমন নেতৃত্ব খুঁজছেন যারা জুলাই আন্দোলনের মূল দাবিগুলো, যেমন- মেধার মূল্যায়ন, বাকস্বাধীনতা ও সুশাসন নিশ্চিত করবে।
বেইলী রোড: যেখানে সংস্কৃতি ও রাজনীতি একাকার
বুধবার সকাল ১০টা। বেইলী রোডের নাটক সরণিতে ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। কয়েকজনের একটি দল নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল। সেখানে কথা হয় চারুকলার শিক্ষার্থী মৃত্তিকার সঙ্গে। বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে নির্ভয়ে বাউল গান আর রবীন্দ্র সংগীতের চর্চা হবে। আমরা চাই আগামীর সংসদ সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে ধারণ করবে। কাল ভোট দিতে যাব শাড়ি পরে, কপালে টিপ দিয়ে। এটা আমার প্রতিবাদ, এটাই আমার উৎসব।
সানজিদা ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, আমরা কাল ভোট দেব পরিবর্তনের আশায়। যে সরকারই আসুক, তারা যেন তরুণদের মেধা ও আবেগের মূল্য দেয়। কালকের দিনটা আমাদের, আগামী পাঁচ বছরও যেন আমাদেরই থাকে।

