গুজব ও অপপ্রচারের ছড়াছড়ি সচেতনতা জরুরি

Date: 2026-02-19
news-banner

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ। এই নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে গুজব, ভুয়া সংবাদ, মিথ্যা তথ্য, ফেক ফটোকার্ড, বানানো ভিডিওর প্রচার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ভোটের আগের দিনও এই অপপ্রচার রোধ করা যায়নি। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অপতথ্য শুধু ভোটারদের বিভ্রান্তই করছে না, বরং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকেও হুমকির মুখে ফেলছে। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে ভোট শুধু ব্যালট বাক্সের লড়াই নয়; এটি ভার্চুয়াল জগতে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার কঠিন পরীক্ষা। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন ভোটারের সচেতনতা।
দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। এর মধ্যে ছয় কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন, ইউটিউব ও টিকটকের ব্যবহারকারীও কোটি ছাড়িয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিশাল ডিজিটাল উপস্থিতির সুযোগ নিয়েই জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারের মাত্রা বেড়েছে। 

গতকাল বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ঘেঁটে দেখা গেছে, কুমিল্লায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ভোটকেন্দ্রে হামলার দাবিতে একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাক্টচেকার প্রতিষ্ঠান ডিসমিস ল্যাব যাচাই করে দেখেছে, এটি চার বছর আগের একটি ঘটনার ভিডিও, যা নতুন ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। একইভাবে নোয়াখালীতে কেন্দ্র দখলের দাবিতে ছড়ানো একটি ভিডিও আসলে যৌথ বাহিনীর মহড়ার দৃশ্য। ফেনীর দাগনভূঞায় জামায়াত কর্মীর বাড়ি থেকে ব্যালট পেপার উদ্ধারের দাবিটিও ফ্যাক্টচেকে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এ ধরনের পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ও ছবি নতুন দাবি জুড়ে প্রচার করে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হচ্ছে।

ফ্যাক্টচেক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু একটি সামাজিক মাধ্যমেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে অন্তত সাত লাখ ভুয়া পোস্ট শনাক্ত হয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই পরিচালিত হয়েছে দেশের বাইরে থেকে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সব মিলিয়ে এক বছরে রাজনীতির বিষয়ে ২ হাজার ২৮১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা অন্যসব ক্যাটেগরি থেকে বেশি। 

ডিসমিস ল্যাবের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ছড়ানো অপতথ্যের বড় অংশেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বছরজুড়ে যাচাই হওয়া স্বতন্ত্র ভুল তথ্যের প্রায় ১০ শতাংশই (৪১৭টি) ছিল এআই দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ প্রতি ১০টির একটি। রাজনীতি, নির্বাচন, দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও পরিবেশ– সব ক্ষেত্রেই এআই-নির্মিত ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশন এসব অপপ্রচারের বিষয়ে ভোটারদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একটি মহল ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। তাই সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো কোনো তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের বয়স, পেশা ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা চালাচ্ছে, যা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া অডিও, জাল ফটোকার্ড ও মনগড়া গ্রাফিক্স ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতাও বেড়েছে। এসব কনটেন্ট অনেক সময় মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের মতো দেখানো হয়। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার তুলনামূলক কম হওয়ায় মানুষ সহজেই এসব ভুয়া কনটেন্টে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে জনমত গঠনে, যা শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলকেও প্রভাবিত করতে পারে। নির্বাচনী আচরণবিধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ডিজিটাল রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী জানান, এআই নির্মিত ভিডিওগুলোর মধ্যে নিখাদ প্রচারণামূলক থেকে শুরু করে বিদ্বেষমূলক, আক্রমণাত্মক, এমনকি ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক কনটেন্টও আছে। কেউ নির্বাচনের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে। কেউ দলের পক্ষে কেউ বিপক্ষে। আর কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ছাড়াই অ্যালগরিদমও এগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ায় এসব ভিডিওতে সয়লাব সামাজিক মাধ্যম।

এই পরিস্থিতিতে অপতথ্য ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ডিপফেক ও ভুয়া সংবাদ ছড়ানো রোধে কঠোর আইন ও নীতিমালা কার্যকর করা, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে বাধ্যতামূলক শনাক্তকরণ চিহ্ন ব্যবহার, নির্বাচন কমিশনের অধীনে শক্তিশালী ফ্যাক্টচেক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। 

advertisement image

Leave Your Comments

Trending News