সৌদিতে রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড, অধিকার গোষ্ঠীগুলোর নিন্দা
Date: 2025-12-23
সৌদি আরব টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বার্ষিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক প্রচারণা গোষ্ঠী ‘রিপ্রিভ’-এর মতে, এই বছর কমপক্ষে ৩৪৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যার সংখ্যা ২০২৪ সালে মোট ৩৪৫ জন ছিল। সংস্থাটি সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ওপর নজর রাখে এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যাও হিসাবে রাখে।
তারা আরো জানিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশেটিতে মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এ বছর।
সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন।এ বছর যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন সাংবাদিক ও দুজন যুবক রয়েছেন। তারা গ্রেপ্তারের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। আবদুল্লাহ আল-দেরাজি ও জালাল আল-লাব্বাদ নামের ওই দুই যুবককে শিয়া সম্প্রদায়ের হয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দণ্ডিত করা হয়।
এ ছাড়া গত জুনে সাংবাদিক তুর্কি আল-জাসিরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ঘটনাটিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে ইউনেসকো। মানবাধিকার সংগঠন রিপ্রিভের তথ্যমতে, চলতি বছর যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মাদকসংক্রান্ত অহিংস অপরাধে অভিযুক্ত ছিলেন।জাতিসংঘের মতে, এসব সাজা আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
রিপ্রিভ জানায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অর্ধেকেরও বেশি ছিলেন বিদেশি নাগরিক। যাদের সৌদি সরকারের ঘোষিত ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর অংশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।রিপ্রিভের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক প্রধান জিদ বাসিয়ুনি বলেন, ‘সৌদি আরব এখন কার্যত সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সঙ্গে কাজ করছে। এটি মানবাধিকার ব্যবস্থাকে প্রায় উপহাস করার শামিল।
’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, সৌদি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় নির্যাতন এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় একটি প্রচলিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।রিপ্রিভ এই পরিস্থিতিকে ‘নৃশংস ও স্বেচ্ছাচারী দমন-পীড়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে নিরীহ মানুষ ও সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আটক ও শাস্তির মুখোমুখি করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার একজন তরুণ মিসরীয় জেলে ইসাম আল-শাজলির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ২০২১ সালে সৌদি জলসীমায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন, তাকে মাদক পাচারের অপবাদ দেওয়া হয়েছে। রিপ্রিভ জানিয়েছে, ৯৬টি মৃত্যুদণ্ড কেবলমাত্র গাঁজার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
রিপ্রিভের কর্মকর্তা জিদ বাসিয়ুনি বলেছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ কাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে খুব একটা ভাবছে না। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে একটি কঠোর বার্তা দেওয়া। তিনি বলেন, প্রতিবাদ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা মাদক—যে বিষয়ই হোক না কেন, সৌদি সরকারের নীতি হলো একেবারে শূন্য সহনশীলতা।
২০২২ সালের শেষের দিকে সৌদি আরব মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর থাকা অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ তুলে নেয়। এর পর থেকেই এ ধরনের মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এই সিদ্ধান্তকে ‘গভীর দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছে।
মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্বজনরা পরিচয় গোপন রেখে বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা এখন ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একজন স্বজন বলেন, ‘শুধু শুক্র ও শনিবারই আমি ঘুমাতে পারি, কারণ এই দুই দিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না।’
রিপ্রিভ আরো জানায়, ‘অনেক ক্ষেত্রে কারাগারে বছরের পর বছর একসঙ্গে থাকা বন্দিদের জোর করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা অন্য বন্দিদের জন্য ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রেকর্ডকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির গবেষক জোয়ি শেয়া বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও বিনোদন অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছে।
এদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মরিস টিডবল-বিঞ্জ অবিলম্বে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা ও দণ্ড কার্যকর করার আগে পরিবারকে অবহিত করা জরুরি।
সূত্র : বিবিসি

