যুক্তরাষ্ট্রের নজর ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর?
Date: 2025-12-24
ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে মার্কিন বাহিনী। তারা ধারাবাহিকভাবে ভেনেজুয়েলার ছোট নৌকাগুলোতে হামলা করে আসছে মাদক পরিবহনের অভিযোগে। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার তেল পরিবহনকারী ট্যাংক আটক করেছে এবং নিষিদ্ধ করেছে। কারাকাসের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন এখন আরো ঘনীভূত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি অনুসারে, আসলেই মাদক পাচারের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শন? কারাকাসের আশঙ্কা অনুয়াযী, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চায়? আবার তেলের বিষয়টি কী হতে পারে? কারণ, ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি পরিমাণে তেল মজুদ রয়েছে।
ব্রাজিলের বামপন্থী রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেছেন, ‘আমি জানি না, আগ্রহ শুধু ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতিই কি না? তিনি ক্রমবর্ধমান বিরোধে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘তাদের সমস্ত তেল’ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন এবং বলেছেন, ‘আমরা এটি ফেরত চাই।’
তেল
বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলো ১৯২০-এর দশকে ভেনেজুয়েলায় প্রথম তেল আবিষ্কারের পর থেকেই সেখানে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে আসছে।
ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বহু তেল শোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে এবং এখনো নতুন শোধনাগার তৈরি হচ্ছে।২০০৫ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ। সে সময় প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হতো। তবে ২০০৭ সালে সমাজতান্ত্রিক নেতা হুগো শ্যাভেজ মার্কিন কম্পানিগুলোর সম্পত্তি জব্দ করে তেল শিল্পকে আরো বেশি জাতীয়করণের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।
এখন?
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে প্রতিদিন তিন মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি উৎপাদনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নেমে এসে, বর্তমানে ভেনেজুয়েলা দিনে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। এটি বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের আনুমানিক ২ শতাংশ। বিশেষ লাইসেন্সের আওতায় মার্কিন কম্পানি শেভরন মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ তেল উত্তোলন করে।
ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল পাঠানোর অনুমতি পাওয়া একমাত্র কম্পানি হলো শেভরন। ভেনেজুয়েলার তেল খাতের একটি সূত্র অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির অভ্যন্তরীণ তেলশিল্পে দুর্নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং ২০১৯ সাল থেকে কার্যকর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটেছে।বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো পুনর্গঠনে যে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন, তা বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীল সরবরাহ ও কম দামের প্রেক্ষাপটে মার্কিন কম্পানিগুলোর কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় হবে না।
ভেনেজুয়েলার পেট্রোলিয়াম অর্থনীতির অধ্যাপক কার্লোস মেন্ডোজা পোতেয়ার মতে, ওয়াশিংটনের পদক্ষেপগুলো সম্ভবত শুধু তেল নিয়ে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকা মহাদেশকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে দাবি করার বিষয়টির সঙ্গেই বেশি জড়িত। তিনি আরো বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ‘বিশ্ব ভাগাভাগি’ করে নেওয়ার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কম্পানি পিডিভিএসএ-এর সাবেক সহসভাপতি হুয়ান সাবোর মতে, ভেনেজুয়েলা কালোবাজারের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে, যার বেশির ভাগই যায় চীন ও অন্যান্য এশীয় দেশে।
মার্কিন অবরোধ
ভেনেজুয়েলা থেকে আসা-যাওয়া করা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৬ ডিসেম্বর এ অবরোধের ঘোষণা দেন। এর কয়েক দিন আগেই মার্কিন বাহিনী এম/টি স্কিপার নামের একটি তথাকথিত ‘ভূতুড়ে’ ট্যাংকার জাহাজ জব্দ করে। জাহাজটি ভেনেজুয়েলার এক মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল তেল বহন করছিল, যা কিউবার উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল বলে জানানো হয়।
ওয়াশিংটন জানিয়েছে, জব্দ করা এই তেলের মূল্য আনুমানিক ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই তেল নিজেদের দখলে রাখার ইচ্ছা পোষণ করছে। এদিকে গত সপ্তাহান্তে মার্কিন কোস্ট গার্ড সেঞ্চুরিজ নামের আরেকটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে। ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম নামের একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য মতে, জাহাজটি চীনের মালিকানাধীন এবং পানামার পতাকাবাহী।
এএফপির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেঞ্চুরিজ জাহাজটি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ছিল না। তবে হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, জাহাজটিতে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল তেল ছিল।
রবিবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, কোস্ট গার্ড আরো একটি তেলবাহী জাহাজের পেছনে ধাওয়া করছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য মতে, জাহাজটির নাম বেলা ১, যা ইরানের সঙ্গে কথিত সম্পর্কের কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তবে পিডিভিএসএ দাবি করেছে, এই অবরোধ সত্ত্বেও তাদের তেল রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি।
সাবেক পিডিভিএসএ কর্মকর্তা হুয়ান সাবো বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে কম্পানিটির কাছে মাত্র কয়েক দিনের জন্য তেল মজুদ রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
প্রভাব
ভেনেজুয়েলার তেলকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য যা-ই হোক না কেন, বিশ্লেষকদের মতে এই অবরোধ অব্যাহত থাকলে তা আন্তর্জাতিক শিপিং কম্পানিগুলোর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে।
সাবেক পিডিভিএসএ কর্মকর্তা হুয়ান সাবোর আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। এর ফলে কালোবাজারের মাধ্যমে হওয়া তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ হারাবে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে কার্যত শ্বাসরুদ্ধ করে তুলতে পারে এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি মাদুরোর পদত্যাগ দাবি করা থেকে এখনো বিরত রয়েছে, তবু সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
ট্রাম্প একদিকে বলেছেন, তিনি ভেনেজুয়েলার সঙ্গে কোনো যুদ্ধ প্রত্যাশা করেন না। অন্যদিকে মন্তব্য করেছেন, মাদুরোর ‘দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে’।
এদিকে সোমবার মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোয়েম ফক্স নিউজকে বলেন, তেলবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনাগুলো বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। তার ভাষায়, ‘মাদুরো যে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত, তা আর মেনে নেওয়া হবে না। তার সরে যাওয়া প্রয়োজন।’
সূত্র : আরব নিউজ

